আল্লাহর উপর ভরসা করার পুরস্কার
মুমিন বান্দারা সব রকম পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। আল্লাহ সুবহানুতায়ালা, বিশ্বাসী বান্দাদের পাখির মতো রিজিক দান করেন। আজকের আর্টিকেল আমরা, আল্লাহর উপর বিশ্বাস করার পুরস্কার সম্পর্কে জানব, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ্র উপর ভরসা
সুখে-দুখে, সম্পদে বিপদে সর্ব অবস্থায় আল্লাহর উপর আমাদের ভরসা রাখতে হবে। এই নির্ভরতা কখনোই ঐ সব জালেম,জাহেলদের মতো হবে না যারা সুযোগ-সুবিধা ও উপায়-উপকরন হাতের নাগালে পেলে আল্লাহকে ভুলে বসে এবং উপায় উপকরণ নিয়ে মেতে থাকে। আর সুযোগ-সুবিধা ও উপায় হাত ছাড়া হয়ে গেলে তখনই কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে। মুমিন বান্দা যতই তার রবের উপর ভরসা করবে ততই তার প্রতি সু-ধারণা পোষণ করবে। সে জেনে রাখবে যে আল্লাহর উপর যে ভরসা করে তার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। তার আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। এত করে তার অন্তর অস্থিরতায় ভুগবে না এবং দুনিয়া তার হাতে এলো কিংবা হাত ছাড়া হল তাতে সে কোন পরোয়া করবে না। কেননা,সে তো শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করে। যেমন,একটা বাদশা কোনো লোককে টাকা দিল কিন্তু,দুর্ভাগ্যবশত তা চুরি হয়ে গেল। তখন বাদশা বলল,চিন্তা করো না আমার কাছে প্রচুর টাকা আছে। তুমি যখনই আমার কাছে আসবে আমি তো আমার কোষাগার থেকে কয়েকগুণ করে দেব।
সুতরাং, তিনি মুমিন বান্দা তিনি জানেন যে আল্লাহ সকল বাদশাহর বাদশা। তার ভান্ডার সবসময় পরিপূর্ণ থাকে। দুনিয়ার কোন স্বার্থ ছুটে গেলে সে পেরেশান হয় না বা অস্থিরতা বোধ করে না।
হাদিসের কুদসিতে এসেছে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন,"আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার নিকট ঠিক তেমনি।"
সুতরাং, সুধারনা যেমন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল এর দিকে আহ্বান জানায়। তেমনি, আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল এর মাঝেও অবশ্যই সুধারণা থাকে।
হাদিসে বর্ণিত, আর আসবি বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,এক ব্যক্তি বলল হে আল্লাহর রাসূল আমি কি আমার উটটাকে বেঁধে রেখে আল্লাহর উপর ভরসা করব নাকি তাকে বন্ধন মুক্ত রেখে ভরসা করব। তিনি বললেন, "আগে বেঁধে রাখো তারপর ভরসা করো"
[তিরমিজি -২৫১৭]
আমরা তিনটি ঘটনা থেকে জেনে নিব আল্লাহর উপর ভরসা করার ফজিলত সম্পর্কে।
এক মহিলার গল্প
একজন জনৈকা মহিলা মদিনাতে তার বাড়িতে ছিল। অতঃপর ,সে মুসলিম সেনা দলের সাথে যুদ্ধে যাত্রা করেছিল। বাড়িতে সে বারোটা ছাগল এবং তার কাপড় বুনুনের একটা তাঁত, কাঁটা, মাকু রেখে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে এসে দেখে তার ছাগল পাল থেকে একটা ছাগল আর তার সে তাঁত, কাঁটা, মাকু নেই। সে তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলল, হে আমার মালিক! তুমি তো বলেছ তোমার রাস্তায় যে বের হবে তার হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছো তুমি নিজেই। এদিকে আমি তোমার রাস্তায় বের হয়ে ফিরে এসে দেখছি, আমার ছাগল পাল থেকে একটা ছাগল আর কাপড় বুননের তাঁত,কাঁটা,মাকু নেই। আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, আমার ছাগল ও তাঁত, কাটা, মাঁকু ফিরিয়ে দাও।
সে মহিলা তার মালিকের নিকট কঠিনভাবে যে শপথ করেছিল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বারবার তার উল্লেখ করলেন। অবশেষে, মহিলাটি সকালবেলা তার ছাগল ও অনুরূপ একটা ছাগল আর তাঁত,কাঁটা,মাকু এবং অনুরূপ একটা তাঁত,কাঁটা, মাকু ফিরে পেল। সুবহানাল্লাহ! কি ভীষণ ব্যাপার।
এই মহিলা আল্লাহর উপর প্রকৃতপক্ষে ভরসা করেছিল। ফলে,আল্লাহ কেবল তার ছাগলের হেফাজত করেনি বরং তাওয়াক্কুল এর বরকতে তা দ্বিগুণ করে দিয়েছেন।"
[আহমদ ২০৬৮৩, ছহিহাহ-২৯৩৫]
দ্বিতীয় ঘটনা, একজন দম্পতির
ইমাম (আহমদ রহ.) আরেকটি ঘটনা তার সনদে আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, অতীত কালে দুজন স্বামী স্ত্রী ছিল। ধন সম্পদ বলতে তাদের কিছুই ছিল না। স্বামী বেচারা একদিন সফর করে বাড়ি ফিরে এলো। সে ছিল প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। ক্ষুধায় অবসন্ন হয়েছে তার স্ত্রী বলল, তোমার কাছে খাবার মত কিছু আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ,সুসংবাদ শোনো তোমার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক এসেছে। মহিলাটির কাছে আসলে কিছু ছিল না। কেবলই আল্লাহর উপর আশা ভরসা ও নির্ভর করে সে কথা বলেছিল। পুরুষ লোকটা বলল তোমার ভালো হোক। তোমার কাছে কিছু থাকলে, একটু জলদি করো। সে বলল, হ্যাঁ আছে। একটু সবর কর, আমরা আল্লাহর রহমতের আশা করছি। এভাবে যখন তার খোদা দীর্ঘায়িত হয়ে চলল তখন সে তার স্ত্রীকে বলল, তোমার উপর রহম হোক। ওঠো, দেখো,তোমার কাছে রুটি থাকলে তা নিয়ে এসো। আমি প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আর সহ্য করতে পারছি না । স্ত্রী বলল, তাড়াহুড়ো করোনা, খাবারের বন্দোবস্ত হলো বলে। এভাবে কিছুক্ষণ কেটে গেলে যখন স্বামীটা আবার কথা বলবে বলবে এমন সময় স্ত্রী মনে মনে বলল, আমি উঠে গিয়ে আমার চুলাটা দেখি না। সে গিয়ে দেখল, চুলা ছাগলের রানের গোশতে ভরপুর হয়ে আছে, আর তার যাতা দুটো থেকে আটা বের হয়ে চলেছে। সে যাতার নিকট থেকে আটা সব বের করে দিল এবং চুলা থেকে ছাগলের রানের মাংস বের করে আনলো।
আবু হুরাইরা (রা.) বলেন,যার হাতে আবুল কাশেম মুহাম্মদ ইসলামের জীবন মহিলাটি যদি তার দুই যাঁতাই যা আটা ছিল তা যদি ঝাড়া মুছা না করতো তাহলে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত যাতা টি তাকে আটা দিয়ে যেত।
আরো পড়ুনঃ যে তিন ঘরে আপনার মেয়েকে কখনোই বিয়ে দেবেন না
তৃতীয় ঘটনা, ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,"ইব্রাহিম আলাইহিস ওয়া সাল্লাম একবার তাঁর স্ত্রী সারাকে সাথে নিয়ে হিজরত করলেন। এমন এক জনপদে প্রবেশ করলেন যেখানে একজন অত্যাচারী শাসক ছিল। তাকে বলা হল যে, ইব্রাহিম নামক এক ব্যক্তি নারীদের মধ্যে সবচেয়ে পরমা সুন্দরী এক নারী কে নিয়ে আমাদের এখানে প্রবেশ করেছে। সে বাদশা, তাঁর নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করল, ইব্রাহিম! তোমার সাথে নারী কে? তিনি নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বললেন, "সে আমার বোন।"এরপর তিনি সারা এর কাছে ফিরে এসে বললেন তুমি আমাকে মিথ্যা প্রমাণিত করো না। আমি তাদের বলেছি যে তুমি আমার বোন।
আল্লাহর কসম, দুনিয়াতে এখন তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ মুমিন নেই। সুতরাং, আমি ও তুমি দ্বীনি ভাই বোন। এরপর ইব্রাহিম আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বাদশার নির্দেশে সারা কে বাদশা এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। বাদশা তার দিকে অগ্রসর হলো। এ সময় সারা অজু করে সালাত আদায় দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, যদি আমি তোমার উপর এবং তোমার রাসূল ইব্রাহিমের উপর ঈমান এনে থাকি এবং আমার স্বামী ব্যতীত সকল মানুষ হতে আমার লজ্জা স্থান সংরক্ষণ করে থাকি। তাহলে,তুমি এ কাফের কে আমার উপর জয়ী করো না। তৎক্ষণাৎ,বাদশা বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে মাটির উপর পা দিয়ে আঘাত করতে লাগলো।
তখন সারা বললেন,"হে আল্লাহ! এ লোক যদি এভাবে মারা যায় তাহলে লোকেরা বলবে স্ত্রী লোকটি একে হত্যা করেছে। এরপর সেই বাদশা জ্ঞান ফিরে পেল। এরকম অবস্থা তিনবার ঘটলো। তারপর বাদশা বলল, আল্লাহর কসম! তোমরা তো আমার নিকট এক শয়তানকে পাঠিয়েছো। একে ইব্রাহিমের নিকট ফিরিয়ে দাও এবং তাঁর জন্য হাজেরা কে হাদিয়া স্বরূপ দান কর। সারা ইব্রাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে এসে বললেন আপনি কি জানেন আল্লাহ তাআলা কাফেরকে লজ্জিত, নিরাশ করেছেন এবং সে একজন দাসী হাদিয়া হিসেবে দিয়েছে।"
[বুখারী-২২১৭]
আল্লাহর উপর কেন ভরসা করব?
বিমানে আপনি নিশ্চিন্তে বসে থাকেন যদিও আপনি পাইলটকে চিনেন না। রেলগাড়ীতে আপনি আরামে বসে থাকেন, যদিও আপনি রেল চালককে চেনেন না। বাসে আরাম করে বসে থাকেন যদিও আপনি বাস চালককে চেনেন না। তাহলে, জীবন নিয়ে আপনি এত অনিশ্চিত কেন? যখন জানেন আল্লাহ আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রক। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। নিশ্চয়ই তিনি, সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।
আল্লাহর উপর ভরসা করার পুরস্কার
৫।যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে শয়তান কখনো তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘তার আধিপত্য চলে না তাদের ওপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার ওপর ভরসা রাখে’ (সূরা নাহল-৯৯)।.
৬। আল্লাহর ওপর ভরসাকারী বান্দাকে আল্লাহভালোবাসেন, পবিত্র কুরআনে এভাবে আসছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন’ (সূরা আলে ইমরান-১৫৯)।
৭। হাদিসেএসেছে, নবিজি (সা.) বলেন, "আমার সামনে একবার বিভিন্ন নবির উম্মতকে পেশ করা হয়। তখন আমি নবিদের সঙ্গে তাদের উম্মতকে দেখলাম। কোনো কোনো নবির সঙ্গে একটি দল, কারও সঙ্গে দশজন, কারও সঙ্গে পাঁচজন, আবার কোনো নবি একা একাই চলছেন। হঠাৎ, বড় একটি দল দেখে আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, এরাই কি আমার উম্মত? তিনি বললেন না। আপনি ও দিকে দেখুন।নবিজি (সা.) বলেন, আমি সেদিকে তাকাতেই বিশাল একটি দল দেখলাম। জিবরাইল বললেন, এরাই আপনার উম্মত। এদের সম্মুখভাগের সত্তর হাজার লোক হিসাব ছাড়া ও কোনো আজাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তাঁরা কারা? জিবরাইল বললেন, তারা ঐ সব লোক, যারা অবৈধভাবে ঝাড়-ফুঁক দেয় না, নেয়ও না এবং পাখির মাধ্যমে গণনা করে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করাকে বিশ্বাস করে না, বরং সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর ওপরেই ভরসা করে।(বুখারি শরিফ-৬১৭৫)
আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। আমাদের কোন মাবুদ নাই, আমাদের কোন পালনকর্তা নাই এবং রিযিক দরকার নেই। সুতরাং, যেকোনো কঠিন মুহূর্তে আমাদের আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। আল্লাহর উপর ভরসা করলে ইনশাআল্লাহ সকল পরিস্থিতিতে উনি আমাদের উদ্ধার করবেন। আল্লাহ ছাড়া আমাদের আপন বলতে কেউ নেই। আল্লাহ, আমাদের সবাইকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়ার তৌফিক দান করুক, আমিন।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url